মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে বিজেপি বিরোধী দলগুলির ব্রিগেড সমাবেশের এক সপ্তাহও বাকি নেই। কোন কোন দল সেখানে অংশ নেবে, কারা আসবেন, কোন শীর্ষ নেতৃত্ব নিজে না এসে প্রতিনিধি পাঠাবেন তা এখন এরাজ্য তো বটেই, জাতীয় রাজনীতিতেও অন্যতম চর্চার বিষয়। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ১৯ শে জানুয়ারির ব্রিগেড সমাবেশ থেকে তৃণমূল নেত্রী কী বার্তা দেন? বা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কে চন্দ্রশেখর রাও, কুমারস্বামী, স্ট্যালিনের মতো নেতারা কী বলেন? মোদ্দা কথায়, কংগ্রেস সম্পর্কে কী অবস্থান নেবে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী জাতীয় এবং আঞ্চলিক দলগুলি সেদিকেও এখন তাকিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহল, বিশেষ করে বিজেপি।
উত্তর প্রদেশে যেভাবে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে সপা এবং বিএসপি জোট করে ফেলেছে, একইভাবে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাডু, কর্ণাটক, দিল্লি, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্র প্রদেশের মতো রাজ্য, যেখানে কংগ্রেসের শক্তি অন্য জাতীয় এবং আঞ্চলিক দলগুলির তুলনায় অনেক কম সেখানে রাহুল গান্ধীর ভবিষ্যৎ কী হবে তাই হতে চলেছে আসন্ন লোকসভা ভোটের আগে গুরুত্বপূর্ণ চর্চার বিষয়। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট সরাসরি জোটের দরজা খুলে দিল কংগ্রেসের জন্য। ২০১৬ সালের বিধানসভার মতোই ২০১৯ লোকসভা ভোটেও যে বাংলায় সিপিএম নেতারা কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের ব্যাপারে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। এক্ষেত্রে বাংলার জোটপন্থী নেতাদের হাত আরও শক্ত করেছে কংগ্রেসের ব্যাপারে নরমপন্থী নেতা সীতারাম ইয়েচুরির দলের সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকা।
রবিবার প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে প্রয়াত নিরুপম সেনের স্মরণ সভায় সরাসরি জোটের কথা না বললেও সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি এবং রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রর পরিষ্কার ইঙ্গিত, বিজেপি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সঙ্গেই হাত মেলাবেন তাঁরা। জোট নিয়ে একই অবস্থানে থাকা দুই নেতাই স্পষ্ট করেছেন, বিজেপি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিরোধী ভোট যেন ভাগাভাগি না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু কী ফর্মুলায় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের নেতাদের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট আলোচনা শুরু হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। বরং এক্ষেত্রে রাজ্য সিপিএম নেতারা আরও একটু দেখে নেওয়ার পক্ষপাতী। এখন তাঁরা বিশেষ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন এটা দেখতে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা আগামী ১৯ শে জানুয়ারির ব্রিগেড সমাবেশে কংগ্রেস কী অবস্থান নেয়। উত্তর প্রদেশের সপা-বিএসপি জোট প্রসঙ্গে এদিন ইয়েচুরি বলেন, অখিলেশ-মায়াবতী যে ঘোষণা করেছেন সেখানে কংগ্রেস নেই। কিন্তু গঙ্গা দিয়ে এখনও অনেক জল গড়ানো বাকি। জাতীয় রাজনীতি সম্পর্কে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল সিপিএম সাধারণ সম্পাদক জানেন, হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যে সরকার গঠন করলেও অন্যান্য একাধিক রাজ্যে কংগ্রেস একটু ব্যাকফুটে আছে। পায়ের তলায় জমি শক্ত করে লোকসভায় সম্মানজনক ফল করতে কংগ্রেসকে বিভিন্ন রাজ্যে কারও না কারও হাত ধরতেই হবে। তাই সিপিএম এখন দেখে নিতে চাইছে, বিজেপি বিরোধী ফেডারেল ফ্রন্টের প্রবক্তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর কয়েকদিন বাদেই কংগ্রেস সম্পর্কে কী অবস্থান ঘোষণা করেন। পাশাপাশি, কংগ্রেস ব্রিগেডে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মঞ্চে অংশ নেয় কিনা, আর অংশ নিলে কোন স্তরের নেতা ব্রিগেডে আসেন তাও আলিমুদ্দিনের কাছে এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাহুল বা সোনিয়া গান্ধী ব্রিগেডে এলে বলাই বাহুল্য সিপিএমের জোট প্রক্রিয়া জোর ধাক্কা খাবে। রাহুল-সোনিয়া নিজেরা না এসে প্রতিনিধি পাঠালে ব্যাপারটা খানিকটা স্বস্তির হবে আলিমুদ্দিনের কাছে। সেক্ষেত্রে এরাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট প্রক্রিয়া অনেকটাই গতি পাবে। আর সেই কারণেই কংগ্রেস দিল্লি নেতৃত্বকে রবিবার কলকাতার অনুষ্ঠান থেকে স্পষ্ট জোট বার্তা দিয়ে রাখলেন সীতারাম ইয়েচুরি, সূর্যকান্ত মিশ্ররা। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্রিগেড সমাবেশের দিন পাঁচেক আগে সিপিএম আগেভাগেই ইঙ্গিত দিয়ে রাখল, বাংলায় কংগ্রেসের জন্য তাদের দরজা খোলা। এখন তৃণমূলের ব্রিগেড সমাবেশের মুখে বল কংগ্রেসের কোর্টে। বাংলায় তারা কী নির্বাচনী কৌশল নেবে? একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফ্রন্টে ছোট শরিক হয়ে ব্রিগেডে অংশ নেওয়া, অন্যদিকে সিপিএমের ডাকে সাড়া দিয়ে ব্রিগেড সমাবেশ নিয়ে কৌশলগত কোনও অবস্থান নেওয়া। কংগ্রেস কী করবে সেদিকে তাকিয়ে হাতের একটা তাস আগাম ফেলে রাখল সিপিএম!

You may also like