কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের লাইনকে কেন ‘সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া’ লেখা হয়েছে, প্রশ্নের মুখে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।
ঘটনার সূত্রপাত, এ বছর মার্চের শুরুতে কলকাতার প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে অনুষ্ঠিত সিপিএমের রাজ্য সম্মেলনে। গত তিন বছরে দলের বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক কার্যকলাপ নিয়ে কাটাছেঁড়া হয় রাজ্য সম্মেলনে। এবং স্বাভাবিকভাবেই সিপিএমের ২০১৮ সালের রাজ্য সম্মেলনে বিতর্কের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ২০১৬ বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা। সম্মেলেনে উপস্থিত দলের একটা বড় অংশের সদস্য যেমন আসন সমঝোতাকে সমর্থন জানান, পাশাপাশি বেশ কয়েকজন তার বিরোধিতা করেন এবং আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের তীব্র সমালোচনা করেন। কেন্দ্রীয় কমিটি এই আসন সমঝোতাকে ‘দলের রাজনৈতিক লাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’ বলে জানালেও, সূর্যকান্ত মিশ্র যে রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেছিলেন, সেখানে জোটকে বৈধতাই দেওয়া হয়েছে বলে সমালোচনায় সরব হন বিভিন্ন জেলার একাধিক নেতা।
সম্মেলেনের শেষ দিন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র জবাবি ভাষণ দেওয়ার পর তীব্র বিতর্ক বাধে গৃহীত রাজনৈতিক লাইন নিয়ে। প্রাক্তন সম্পাদক বিমান বসু মঞ্চ থেকে ঘোষণা করেন, যাঁরা গৃহীত লাইনের পক্ষে তাঁরা যেন হাত তোলেন। অধিকাংশ সদস্যই তাতে হাত তোলেন। কিন্তু কারা গৃহীত লাইনের বিপক্ষে তাঁর মতামত আর বিমান বসু জানতে চাননি। এতেই ক্ষুব্ধ হন বিরোধীরা। প্রথম প্রতিবাদ জানান কলকাতার নেতা এবং রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী দেবেশ দাস। যাঁরা কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে রাজনৈতিক লাইনের বিরোধিতা এবং সমালোচনা করেছেন তাঁদের কেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, এই দাবি তোলেন তিনি। দেবেশ দাস বলেন, ‘সম্মেলনে অনেকেই জোটের বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের সংখ্যাটাও যাচাই করা হোক’। এর পরেই মুখ খোলেন কলকাতার সিটু নেতা দেবাঞ্জন চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটি আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের জোট তত্ত্বকে খারিজ করেছে, তা সত্ত্বেও রাজ্য সম্মেলেনের প্রতিবেদনে তাকেই ঘুরিয়ে সমর্থন করা হয়েছে। এটা অত্যন্ত অনুচিত এবং রাজ্য কমিটি যদি কেন্দ্রীয় কমিটিকে না মানে, তবে নিচুতলার কমিটিও ভবিষ্যতে রাজ্য কমিটিকে মানবে না’। দেবাঞ্জনবাবু বলা শুরু করা মাত্রই উত্তর ২৪ পরগনার শ্রমিক নেতা সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করে দেন। তিনি বলেন, ‘জোট বিরোধীরা যদি সবাই বলতে শুরু করেন, তবে যাঁরা জোটের পক্ষে তাঁদেরও বলতে দিতে হবে’। এরপরেই সম্মেলনে শুরু হয়ে যায় চিৎকার-পালটা চিৎকার, তীব্র হট্টগোল। দু’পক্ষই গলা চড়ায়। কারো কথাই স্পষ্ট করে বোঝা যায়নি, কে কোন পক্ষে বলছেন। একাধিক জোট বিরোধী দাবি করেন, তাঁদের বক্তব্যও রাজনৈতিক দলিলে নথিভুক্ত করতে হবে। মঞ্চ থেকে পুরো ব্যাপারটা দেখে অস্বস্তিতে পড়ে যান বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র, সীতারাম ইয়েচুরিরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমান বসু মাইকে বলতে বাধ্য হন, যাঁরা রাজনৈতিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাঁরাও যেন হাত তোলেন। এরপর পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং জোট বিরোধী একাধিক নেতা হাত তুলে রাজ্য সম্পাদকের পেশ করা রাজনৈতিক-সাংগঠনিক প্রস্তাব এবং জবাবি ভাষণের বিরোধিতা করেন।
এই বিষয়ের এখানেই ইতি পড়তে পারত, কিন্তু পড়ল না। কারণ, সপ্তাহ দুয়েক আগে ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ২৫তম সম্মেলনের রিপোর্টিং নোট’ নামে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। রাজ্য সম্মেলনে যে রাজনৈতিক লাইন গৃহীত হয়েছে তা এই পুস্তিকায় উল্লেখ করা হয়েছে এবং পাঠানো হয়েছে সমস্ত জেলায়।

