Gold ₹143,650/10g
Silver ₹240.40/g
Petrol ₹113.51/L
Diesel ₹99.82/L
Kolkata 26°C
30 June 2026

Lockdown: বাংলা প্রকাশনা ভবিষ্যতের ললাটলিখন পড়তে পারেনি, আমাদের শিখে নিতে হবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কৌশল

আমি ইতিবাচক ভাবতে ভালোবাসি। বিশ্বাস করি, নিশ্চয়ই আমরা শিখে ফেলব। জলে না পড়লে মানুষ সাঁতার শিখতে চায় না

Lockdown: বাংলা প্রকাশনা ভবিষ্যতের ললাটলিখন পড়তে পারেনি, আমাদের শিখে নিতে হবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কৌশল

তাঁদের চোখের সামনে দিয়ে ঘটে গেছে গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক। তাঁরা দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৩ এর মন্বন্তর, দেখেছেন ভয়াবহ ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, দেখেছেন দেশভাগ, লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু অসহায় মানুষের অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। তাঁদের স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট বাষট্টির ভারত-চিন ও পয়ষট্টির ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, ১৯৭১ এর যুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আবির্ভাব। তাঁরা আজও ভুলতে পারেন না উত্তাল সত্তর দশক, নকশাল আন্দোলন। হাজার হাজার তরুণ তরুণী সমাজ বদলের স্বপ্ন নিয়ে খুনের রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, জেলে পঙ্গু হয়ে বা পুলিশের গুলিতে পিঁপড়ের মতো মুছে গিয়েছে চিরতরে।
আজও সেইসব দিনের কথা বলতে গিয়ে তাঁরা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। কথা হচ্ছিল, আশি পেরিয়ে আসা তিন বরেণ্য সাহিত্যিকের সঙ্গে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায় এবং সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। কেমন আছেন তাঁরা এই দুঃসহ গৃহবন্দির দীর্ঘ সময়ে? তবে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে? অদৃশ্য আততায়ীর হানায় সারা পৃথিবী জুড়ে আক্রান্ত লক্ষ-লক্ষ মানুষ, অসহায় মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে! বেড়েই চলেছে!
কোনও প্রতিষেধক এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি কোভিড ১৯ বা করোনা নামের ভাইরাসের মোকাবিলার। একমাত্র রাস্তা লকডাউন। সামাজিক দূরত্ব। তাই দিনের পর দিন স্তব্ধ সব শহর, গ্রাম, কাজকর্ম, কলকারখানা। মাসের পর মাস কেটে যাচ্ছে… কোটি কোটি মানুষ আজ গৃহবন্দি। প্রতিনিয়ত কর্মহীন হচ্ছেন তাঁরা, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা অগুনতি, ভবিষ্যৎ গভীর অমানিশায় ঢাকা।
না, এমন অবস্থা তাঁরা দুঃস্বপ্নেও কখনও দেখেননি। তাঁরা লিখতে পারছেন না, অব্যক্ত যন্ত্রণা তাঁদের কুরে কুরে খাচ্ছে। কী লিখবেন? কেন লিখবেন? কে পড়বে? সৃজনশীল সাহিত্য উপভোগ করার মতো অবস্থায় কে আছে? সকলেই আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। এই দমবন্ধ পরিস্থিতির কবে পরিবর্তন হবে? কবে এই ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় থামবে, কবে আবার সুস্থ, স্বাভাবিক হবে পৃথিবী? কবে আবার ফিরবে জীবনের ছন্দ? কেউ জানে না।

এমনিতেই সামান্য কিছু প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে অধিকাংশ বাংলা সাহিত্য প্রকাশনার অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল। প্রায় সমস্ত ম্যাগাজিন আপাতত বন্ধ। তাহলে কবি সাহিত্যিকদের লেখা কোথায় প্রকাশিত হবে? সৃজনশীল সাহিত্যিকদের জনপ্রিয়তা কি অক্ষুণ্ণ থাকবে? না কি পাঠকের বই পড়ার অভ্যাস স্তিমিত হয়ে যাবে? বাংলা বইয়ের এমনিতেই সীমিত বাজার। এই করোনা কাল পেরিয়ে সেই জগৎ কি আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
প্রশ্ন, প্রশ্নের মিছিল। তাড়া করে ফিরছে আমাদের মতো বাংলা সাহিত্য প্রকাশকদেরও। আমরা নতুন কতগুলো বই ছাপব আগামী দিনে ? ছেপে কী করব? ছাপা শুরু হলেও বিক্রির জায়গা আবার কবে ফিরে পাব ? বইয়ের দোকান বন্ধ, আউটলেট ও সমস্ত বইমল বন্ধ। কবে তারা খুলবে? কবে মানুষ পথে বেরোতে পারবেন? কবে চালু হবে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম? ট্রেন, ট্রাম, বাস?
বাংলা বই জগতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুক্ত প্রায় চার লক্ষ মানুষ। তাঁদের মধ্যে এক বিরাট সংখ্যক মানুষ অতি নিম্নআয়ের, দৈনিক মজুরিতে যুক্ত। কাজ বন্ধ থাকলে তাঁরা কোনও বেতন পান না। আর যাঁরা মাস মাইনের কর্মী, প্রকাশনাদের সেই আর্থিক সঙ্গতি নেই যে তাঁরা কর্মীদের দিনের পর দিন বসিয়ে রেখে মাইনে দিতে পারবেন। এই লকডাউনের ফলে হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারাতে চলেছেন, বাকিদের মাইনে কাটা ছাড়া বাংলার প্রকাশকদের সামনে কোনও পথ খোলা নেই।
বাংলার নবীন প্রবীণ লেখকেরাও আজ বিপজ্জনক জায়গায় দাঁড়িয়ে। প্রকাশকের কাছ থেকে বার্ষিক রয়্যালটি তাঁরা কবে পাবেন, জানেন না। কারণ ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিভিন্ন বই বিপণি থেকে তাঁদের মার্চ মাসের শেষে যে বার্ষিক সমস্ত পাওনা টাকা প্রাপ্তির কথা ছিল, সেও আজ বিশ বাঁও জলের তলায়।
এই ছবি যে শুধু বাংলা প্রকাশনার, সেটা নয়। অন্যান্য শিল্প- বাণিজ্যের মতো সারা ভারতবর্ষের তথা পৃথিবীর সাহিত্য প্রকাশকদের সকলেই আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। কিন্তু তাদের অবস্থা বাংলার প্রকাশনা- শিল্পের চেয়ে অনেকটা ভালো। তার প্রধান কারণ, তাদের দূরদর্শিতা, অপরদিকে আমাদের অযোগ্যতা, অপরিণামদর্শিতা।
বলতে একটুও দ্বিধা নেই, বাংলা প্রকাশনার নির্মাণশৈলী আজ জাতীয় স্তরের সঙ্গে কিছুটা পাল্লা দিতে পারলেও, বিপণন ক্ষেত্রে আমরা ভবিষ্যতের ললাটলিখন পড়তে পারিনি। আমরা বইয়ের হার্ডকপি নিজস্ব এবং বিভিন্ন বইবিপণি থেকে নানাভাবে বিক্রি করতে পেরে আত্মসন্তুষ্ট থেকেছি। তার জন্য কাগজে বিজ্ঞাপন বা রিভিউ করিয়েছি। মুদ্রিত বই বিক্রি হয়েছে রাজ্যের জেলা ও মহকুমাস্তরের বইমেলায়। বিক্রি করেছি ভারতের বঙ্গভাষী অধ্যুষিত নানা শহরে।
এই ভয়ংকর অবস্থার কথা ভাবতেও পারিনি। আমরা ভাবতেই পারিনি, যদি বিপণিগুলি বাধ্যতামূলক ভাবে মাসের পর মাস বন্ধ থাকে, যদি বইমেলা না হতে পারে, তখন কী হবে!
সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগানো, ই- কমার্স প্লাটফর্মগুলোকে পুরোপুরি ব্যবহার করা যে একান্ত জরুরি, যাদের মাধ্যমে আমাদের বই পৌঁছে যেতে পারে রাজ্য ও দেশেবিদেশে, আমাদের ৯৯ শতাংশ বন্ধু এতদিন চোখ বুঁজে ছিলেন। এমনকী, নিজেদের লজিস্টিক সাপোর্ট সিস্টেম তৈরি করার উদ্যোগও বাংলার প্রকাশকরা এতদিন নেননি। তার ফলে যখন অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাঠকের কাছে নিজের বা ই- কমার্স প্লাটফর্মদের মাধ্যমে বই পৌঁছে দেওয়ার কোনও পরিকাঠামো আমাদের নেই। সেটা থাকলে অল্প হলেও বাংলা বই, এই গৃহবন্দির সময়ে, যখন অখণ্ড অবসরে পাঠকরা বাড়িতে পৌঁছে দিলে রাজি, আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। জাতীয় স্তরে অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট ছাড়াও বাংলা বই ই-কমার্স করার জন্য বইঘর.ডট.ইন, বইচই.কম, রিড বেঙ্গলি বুকস… তরুণ উদ্যোগীরা এরকম বেশ কিছু প্লাটফর্ম চালু করেছেন। দুর্ভাগ্য, আমাদের বন্ধুরা তাঁদের বিশেষ পাত্তা দেননি।
একবারও ভেবে দেখেননি, বাংলা বইয়ের ডিজিটাল এডিশন বের করার প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা। আমি নিজে আমাদের বন্ধুদের এই বিষয়গুলি নিয়ে নানাভাবে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছি। পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডে মিটিং করেছি একাধিকবার। এমনকী, যখন কেন্দ্রীয় সরকার পোষিত ন্যাশনাল ডিজিটাল লাইব্রেরি আমাদের বই প্রায় বিনামূল্যে ডিজিটাল এডিশন করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, আমরা ও অতি নবীন দু’একজন প্রকাশক ছাড়া কেউ তাতে একটুও আগ্রহ দেখাননি। ফলতঃ বিষয়টি আর বেশিদূর এগোতে পারেনি।
অথচ এইসময়ে ভারতীয় ইংরেজি প্রকাশনার ছবিটা কী? প্রথমত, তাঁরা ইতিমধ্যেই আসন্ন প্রকাশিতব্য সব বইয়ের ডিজিটাল এডিশন প্রকাশ করে ফেলেছেন। ঘরে বন্দি সারা পৃথিবীর মানুষ সামান্য টাকায় বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্ম মারফত তাঁদের পছন্দের বই কিনছেন, ট্যাব, মোবাইল বা কিন্ডলে সাগ্রহে পড়ছেন।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব প্রকাশকরাই ই-কমার্সের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রেখেছেন। যার ফলে যে মুহূর্তে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে ই-কমার্সের মাধ্যমে হোম ডেলিভারি চালু হবে, পাঠকের পছন্দ করা তাঁদের প্রকাশিত সব বই স্বচ্ছন্দ গতিতে পৌঁছে যাবে ক্রেতাদের বাড়িতে। এবং অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট ও অন্যান্য ই-কমার্স প্লাটফর্ম খুব শীঘ্রই চালু হয়ে যাচ্ছে বলে আমরা জেনেছি।
দেখতে দেখতে প্রায় চল্লিশ বছর হয়ে গেল আমার প্রকাশনা জীবন। সেই অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, করোনার এই বিভীষিকা কাল শেষ হওয়ার পরেও আরও কিছুদিন চালু থাকবে মাস্ক, গ্লাভস, স্যানিটাইজার এবং সামাজিক দূরত্ব বা সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং। সেক্ষেত্রে যদি বাংলা প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তাহলে সময়ের বার্তা আমাদের মাথা পেতে নিতে হবে।
আমাদের শিখে নিতে হবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করার কৌশল, শিখতে হবে ই-কমার্স আর সর্বোপরি শিখতে হবে ডিজিটাল বই তৈরি ও বিপণনের পদ্ধতি। নতুবা — না, আমি ইতিবাচক ভাবতে ভালোবাসি। বিশ্বাস করি, নিশ্চয়ই আমরা শিখে ফেলব। জলে না পড়লে মানুষ সাঁতার শিখতে চায় না।

আরও পড়ুন: ধনখড় পশ্চিমবঙ্গকে কাশ্মীর বানাতে চান! নির্বাচন বন্ধ রেখে ছ’মাস করে রাষ্ট্রপতি শাসনের মেয়াদ বাড়িয়ে বকলমে নিজের শাসন কায়েম করতে চাইছেন

Track Latest News Live on TheBengalStory.com and get news updates from West Bengal and around the world.

Opinion