বামপন্থীদের সমর্থনে পরিচালিত হওয়ার সুবাদে ২০০৪ এর প্রথম ইউপিএ সরকার মানুষের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। দেশের অভ্যন্তরের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এবং তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বামপন্থীদের সমর্থনে এই সরকারের চলা এবং তাদের এই ইতিবাচক পদক্ষেপ মেনে নিতে পারেনি। তাদের প্রচেষ্টা ছিল, কীভাবে ইউপিএ থেকে বামপন্থীদের সরিয়ে দেওয়া যায়। সাম্রাজ্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির এসব প্রচেষ্টা নানাভাবে চলতে থাকে। মানুষের জন্য সেবামূলক পরিষেবার ক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দ বাড়লে দেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে, সংবাদমাধ্যমে এসব কথা প্রকাশ হতে শুরু করে। যদিও অভিন্ন নূন্যতম কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রতি ইউপিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়বদ্ধতা বজায় ছিল। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। তাঁর ব্যক্তিগত আচার আচরণ ও মানুষের প্রতি সৌজন্যবোধ অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত বললে ভুল বলা হবে না। যদিও তাঁর শ্রেণী দায়বদ্ধতার সঙ্গে আমরা বামপন্থীরা সহমত ছিলাম না। কিন্তু আমাদের রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনার যে দীর্ঘ ইতিহাস ছিল, সেই সীমাহীন বঞ্চনারও কিছুটা ইতি ঘটে। রাজ্য সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলির মধ্যে দিয়ে তা প্রতিফলিত হয়। এই ইউপিএ সরকার গঠনের এক বছরের মধ্যে আমার জীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সংযোজন ঘটে।
আমি যে চন্দ্রকোণা জিরাট হাই-স্কুলে লেখাপড়া শিখেছিলাম, তার ১৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের তোড়জোড় শুরু হয় স্কুল পরিচালন সমিতির পক্ষ থেকে। যেহেতু আমি স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র তাই ১৫০ বছরের উদযাপন কমিটির সভায় আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কীভাবে উৎসব উদযাপন করতে হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় সেখানে। তখনই জানতে পারি, এই বিদ্যালয় শুরুর সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে অনেক গুণী মানুষের পদার্পণ ঘটেছিল সেখানে। তাঁদের স্মৃতি বিজরিত এই স্কুল। অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রাচীন স্কুলগুলির মধ্যে এটি তিন নম্বর। মেদিনীপুর কলেজিয়েট, তমলুকের হ্যামিলটনের পরেই চন্দ্রকোণা জিরাট হাই-স্কুল। এই উৎসবের জন্য স্কুলের পরিকাঠামো তৈরিসহ বিস্তারিত যে পরিকল্পনা নেওয়া হয় তাঁর জন্য প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীসহ এলাকার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ীদের থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনার সাথে সরকারি অর্থ কীভাবে পাওয়া যাবে তা দেখার জন্য কমিটির সদস্যরা আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানান।
এই দায়িত্ব পাওয়ার পরে আমি রাজ্যের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী কান্তি বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমার ‌প্রস্তাব শুনে বলেন‌, ‘রাজ্যে হাজার হাজার স্কুল, কোনও একটিকে এভাবে বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য সাহায্য করা সম্ভব নয়।’ হঠাৎ আমার মনে পড়ে, কয়েক বছর আগে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের ১৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেই সময় এই স্কুলের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্ল্যানিং কমিশন থেকে ৫০ লক্ষ টাকা অনুদান হিসাবে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন শ্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। যেহেতু চন্দ্রকোণা জিরাট হাই-স্কুলও মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের সমসাময়িক, আর এই স্কুলের সঙ্গে অনেক বিশিষ্ট মানুষের স্মৃতি জড়িত, তাই এইটুকু তথ্যকে অবলম্বন করে এই অনুষ্ঠানের জন্য দিল্লির অর্থ পাওয়ার ব্যাপারে প্রচেষ্টা গ্রহণে অসুবিধা কোথায়? আর যে মানুষটি সেদিন যোজনা কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন, ২০০৪ এর ইউপিএ সরকারে তিনিই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। ওনার কাছে একবার পৌঁছানোর চেষ্টা করে দেখতে হবে। এই প্রতিজ্ঞা নিয়েই সেই সময় বাংলার এক সাংসদ, আমার খুবই ঘনিষ্ঠ সুধাংশু শীলের সাথে যোগাযোগ করি। তাঁর সঙ্গে সুধাংশুবাবুর সুসম্পর্কের কথা শুনেছিলাম। আমার উদ্দেশ্যের কথা বলতেই সুধাংশু শীল আমায় দিল্লি যেতে বলেন। ২০০৫ এর ২৩ মার্চ আমি দিল্লি যাই।
সংসদ শুরুর আগের দিন ২৪ মার্চ আমাদের অন্যান্য সাংসদ, বাসুদেব আচারিয়া, অনিল বসু এবং লোকসভার স্পিকার সোমনাথদার (সোমনাথ চ্যাটার্জির) সঙ্গে দেখা করলাম। যে উদ্দেশ্যে আমার দিল্লি আসা তা এঁদের সবাইকে বললাম। কিন্তু তাঁদের ইতিবাচক সমর্থন পেলাম না। সুধাংশু শীল ২৫ এপ্রিল যৌথ অধিবেশনের সভাকক্ষে আমাকে নিয়ে গেলেন। ওই দিনই বিকালে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা দফতরের মন্ত্রীর অফিসে সময় নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন সুধাংশু শীল। বিকেল ৫ টার সময় প্রণববাবুর অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলাম। প্রথম সাক্ষাৎপ্রার্থী হিসাবে কেন্দ্রের কোনও মন্ত্রীর অফিসে গিয়ে আমার যে অভিজ্ঞতা হল, সেই জন্য ২৫ মার্চ ২০০৫ তারিখ আমার জীবনে পাকাপাকিভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। সুধাংশু শীল যখন বললেন, ‘দাদা আমি সুশান্তকে নিয়ে এসেছি। ও আমাদের রাজ্যের মন্ত্রী।’ একথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই উনি বলে ওঠেন, ‘আরে ওর পরিচয় করাতে হবে না। সুশান্ত এখন সারা বাংলার অত্যন্ত পরিচিত নাম, সারা বাংলার মানুষ ওকে চেনে। আমিও বাংলার মানুষ। তাই ওকে আলাদা করে পরিচয় করানোর দরকার নেই’। ওনার কথায় আমি হতবাক হয়ে যাই। উনি আরও বলেন, ‘১৯৮৫ তে যখন প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ছিলাম, তখন যে উপনির্বাচনে ও প্রথম জয়লাভ করে এমএলএ নির্বাচিত হয়, সেই গড়বেতা বিধানসভায় আমাদের কংগ্রেস প্রার্থীকে জেতানোর জন্য কংগ্রেসের তরফে এক পদযাত্রায় আমি অংশ নিয়েছিলাম।’ গোটা বিষয়টা উনি এমনভাবে উপস্থাপন করলেন, যেন ঘটনাটা সেদিন ঘটেছে। সবই ওঁর চোখের সামনে ভাসছে। তারপর আরও যা বললেন তাতে ওই মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধায় সেদিন আমার মাথা নীচু হয়ে যায়। ১৯৯৮-৯৯ এর সন্ত্রাস থেকে ২০০১ এর বিধানসভা নির্বাচন, সেখানে আমার ভূমিকা। এমনকী ২০০১ এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে একদিন সন্ধ্যায় আমি কৃষ্ণনগরে এক জনসভায় যাই, সেদিন ওই জনসভা লাগোয়া এক হাইওয়ে ধরে তিনি কলকাতায় ফিরছিলেন। তখন রাস্তার উপর ওনার গাড়ি খারাপ হয়ে যায়। গাড়ি ঠিক হতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। পুরো সময়টা ধরে উনি আমার ভাষণ শোনেন। সেই প্রসঙ্গ তুলে সেদিন সুধাংশুবাবুকে বলেন, ‘একই ভলিউমে নির্বাচনী সমাবেশে এত দীর্ঘ বক্তৃতা, তার মাঝে মানুষের যে উচ্ছ্বাস…’ গড়গড় করে সব বর্ণনা করে গেলেন। যা শুনে আমি প্রায় বাকরোহিত। তারপর হঠাৎ উনি বললেন, ‘এসব কথা পরে হবে। প্রয়োজন নিয়ে দেখা করতে এসেছ, অথচ কথা বলে যাচ্ছি আমি। কী প্রয়োজন সেটাই শোনা বাকি।’ বলে চা বা কফি আনতে বললেন। আমি সবিনয়ে বললাম, ‘আমি তো চা খাই না।’ শুনে উনি বলেন, ‘তুমি রাজনীতি করো, অথচ চা খাও না, এ কীরকম ব্যাপার!’ আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘আমি প্রথম থেকেই চা খেতাম না।’ এরপর আমি আমার প্রয়োজনের কথা বললাম। সেই কথা শুনে উনি বললেন, ‘একটা জরুরি মিটিংয়ে এখনই আমায় বেরোতে হবে। আগামীকাল বিকালে তুমি চলে এস।’ বলে তিনি মিটিংয়ে বেরিয়ে যান।
উনি বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি সুধাংশু শীলকে বললাম, ব্যতিক্রমী মানুষ কেমন হয় দেখুন। রাজ্যের মন্ত্রী আমার বক্তব্য শুনেই আমায় নিরাশ করলেন। লোকসভার সাংসদরা আমার প্রস্তাব শুনে আমায় হতাশ করলেন। আর আমার এত বছরের রাজনৈতিক জীবনে যে মানুষের কোনও দিন সামনা-সামনি হইনি, যিনি কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, কংগ্রেসের অন্যতম বড় নেতা, এত বড় মাপের মানুষ আমার বক্তব্য শোনার পর সাথে সাথে যে ইতিবাচক ভূমিকা নিলেন, তা আমার জীবনে ইতিহাস হয়ে থাকবে। বলে আমরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রক থেকে বেরিয়ে এলাম। সুধাংশু বললেন, কাল বিকালে আমি কলকাতা ফিরে যাব। তুমি একাই চলে এসো, আর কোনও অসুবিধা হবে না।
পরের দিন, নির্ধারিত সময়ে আমি একাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে প্রণববাবুর চেম্বারে পৌঁছলাম। উনি বললেন, ‘সুধাংশুবাবু আসেননি?’ আমি বললাম, ‘কাজের জন্য আজ বিকালেই কলকাতা ফিরে গেছেন, তাই একাই এলাম।’ তারপর উনি বলেন, ‘কাল তো বেরিয়ে গেলাম, তোমার কথা শোনা হল না। আজ বলো।’ তখন আমি চন্দ্রকোণা জিরাট হাইস্কুলের ১৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের যে আবেদন নিয়ে ওনার কাছে পৌঁছেছিলাম, তা বিস্তারিতভাবে বললাম এবং আমাদের লেখা আবেদন পত্রটি ওনাকে দিলাম। ওই আবেদনপত্রে স্কুলের অতীত ইতিহাসের কথাও উল্লেখ করা ছিল। উনি পুরো আবেদনপত্রটি পড়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সুশান্ত এই আবেদন পত্র নিয়ে হঠাৎ আমার কাছে কেন?’ প্রথম দেখার দিন উনি যে আন্তরিকতা দিয়ে আপনজনের মতো ব্যবহার করেছিলেন, তাতে হয়তো আমার আড়ষ্টতা থাকার কথা নয়। তবুও কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বলতে শুরু করলাম, ‘আমাদের এই জেলার মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের ১৫০ বছর পূর্তির সময় আপনি প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। প্ল্যানিং কমিশন থেকে ওই বিদ্যালয়কে ৫০ লক্ষ টাকা সাহায্য দেওয়া হয়েছিল। ওই সূত্র ধরেই ভরসা করে এসেছি। আপনি এখন কেন্দ্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী, তাই আমাদের আবেদন নিয়ে আপনার কাছে এসে উপস্থিত হয়েছি।’ মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, ‘অনেক আশা নিয়েই দাদা আপনার কাছে এসেছি।’
উনি আমার কথা শুনে হেসে উঠে বলেন, ‘তুমি তাহলে ভালো মতো প্রস্তুত হয়েই এসেছ।’ এরপর একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘যোজনা কমিশনের জন্য কোনও চিঠি নিয়ে এসেছো?’ বললাম, ‘হ্যাঁ। চিঠি একটা এনেছি, কিন্তু সেটা চলবে কীনা আপনি একটু দেখে নিন।’ চেয়ারম্যান, প্ল্যানিং কমিশনকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠি ওনার হাতে দিলাম। উনি চিঠিটা খুঁটিয়ে পড়লেন। পড়ার পর বললেন, ‘এ চিঠি চলবে না।’ এরপর উনি ওনার পিএ’কে ডাকলেন। নিজে এই চিঠির উপর ভিত্তি করে প্ল্যানিং কমিশনকে দেওয়া চিঠির ডিকটেশন দিলেন। তারপর পিএ’কে বললেন, ‘এই চিঠিটা ড্রাফট করে নিয়ে এসে আমায় দেখাবে, আমি দেখার পর ফাইনাল টাইপ হবে।’ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, সঙ্গে ১৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের কোনও ছাপানো প্যাড আছে কিনা? আমি বললাম, ‘সভাপতি হিসাবে আমার স্ট্যাম্প আছে কিন্তু প্যাড নেই।’ তখন উনি পিএ’কে বললেন, কম্পিউটার থেকে ১৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের একটি প্যাড বানিয়ে নিয়ে আসতে। আমি বললাম, ‘আমি কি অপেক্ষা করব?’ উনি বললেন,’ড্রাফট করে নিয়ে আসা পর্যন্ত তুমি অপেক্ষা করো। দু-তিনটে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আছে, সেগুলো দেখে নিই। তারপর তোমার সঙ্গে কথা বলছি।’ আধ ঘণ্টার মধ্যে পিএ চিঠির ড্রাফট ও প্যাড নিয়ে এলেন। চিঠি পড়ার পর উনি কয়েকটা জায়গায় সংশোধন করলেন। সংশোধন করে দিয়ে পিএ’কে বললেন, ‘এক্ষুনি টাইপ করে নিয়ে এসো’। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে চিঠির ফাইনাল কপি নিয়ে পিএ ফিরে এলেন। উনি বললেন, ‘তুমি উৎসব কমিটির পক্ষে সই করে স্ট্যাম্প দাও।’ এরপর আমার চিঠির সঙ্গে উনি প্ল্যানিং কমিশন’কে যে ফরওয়ার্ডিং চিঠি দেবেন, তার ডিকটেশন দিলেন পিএ’কে। পিএ চিঠি তৈরি করতে গেল। সে সময় এক গুরুত্বপূর্ণ অফিসার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমি ওনার চেম্বারের মধ্যেই পৃথক বসার জায়গায় গিয়ে বসলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই অফিসারের সঙ্গে কথা বলা শেষ হল তাঁর। আর এর মধ্যেই পিএ চিঠি টাইপ করে নিয়ে আবার হাজির। পিএ’কে উনি বললেন, ‘আমি যে চিঠি প্ল্যানিং কমিশন’কে দিলাম তাঁর একটা কপি বিদ্যালয়ের ১৫০ বছর উদযাপন কমিটির কাছে পাঠাবে। আর প্ল্যানিং কমিশনের দফতরে কালকে সকালেই অফিসের পিওন’কে দিয়ে এই চিঠি পাঠিয়ে দিও।’ এরপর উনি নিজের পার্সোনাল ডায়েরিতে কিছু লিখলেন। আমাকে বললেন, ‘যে জন্য আমার কাছে আসা, সে জন্য আমার যতটা করার করলাম। এবার লেগে থাকার দায়িত্ব তোমার। আমিও প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা হলে ওনার সঙ্গে কথা বলব।’ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি কালই চলে যাবে, না থাকবে?’ বললাম, ‘আপনার কাছে এসেছিলাম, কাজ শেষ হয়ে গেল। কালই ফিরে যাব কলকাতায়।’ উনি তখন বললেন, ‘আবার এলে দেখা কোরও।’ এরপর অবাক করে দিয়ে ওনার পার্সোনাল নম্বর আমাকে দিয়ে বললেন, ‘যখন আসবে, প্রয়োজন হবে তুমি সরাসরি ফোন করবে।’ এরপর বললেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ নেতা মেনন সাহেবের নির্বাচনী এজেন্ট হিসাবে কাজ করতে গিয়ে, মেদিনীপুরের সঙ্গে আমার এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তুমি সেই মেদিনীপুরের মানুষ। আমার রাজ্যের মানুষ, আমি সব সময় তোমাদের সঙ্গেই আছি।’ যে আন্তরিকতা নিয়ে তিনি কথাগুলি বলেছিলেন, তাতে আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। এরপর ওনার কাছ থেকে বেরিয়ে আসার সময় ভাবলাম, যে মানুষটির সঙ্গে আমার সরাসরি চেনাজানা ও সম্পর্ক ছিল না, সেই মানুষটি এই অল্প সময়ের মধ্যে আমাকে এতটা গুরুত্ব দিলেন। যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের মন্ত্রিসভার সহকর্মী থেকে লোকসভার গুরুত্বপূর্ণ সাংসদরা (সুধাংশু শীল বাদে) প্রায় সবাই আমায় হতাশ করেছিলেন। সেই বিষয়টিকে তিনি শুধু গুরুত্ব দিলেন তাই না, ওনার কাজের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্যে আমার জন্য দু-আড়াই ঘন্টা সময় ব্যয়ও করলেন। এ আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনা হলেও সাধারণভাবে ভাবলে এখনও বিশ্বাস হতে চায় না। এরপর এই মানুষটির সঙ্গে আমার আন্তরিকতার এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্ক এখনও প্রগাঢ়। আমার জীবনের প্রতিটি মোড়ের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে গেছে। আমার লেখার পরবর্তী অংশে সে সব বিষয়ে বলব।
এরপর ঘটনাচক্রে যেদিন আমি দিল্লি থেকে ফেরার জন্য এয়ারপোর্টে গিয়েছি, বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখি সুভাষদা (মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী) আমার আগেই সেখানে পৌঁছে অপেক্ষা করছেন। উনিও একই ফ্লাইটে কলকাতায় ফিরবেন। আমাকে দেখেই বললেন, ‘তুমি কবে এসেছিলে? সুপ্রিম কোর্টের কাজে?’ এরপর আমি সুভাষদাকে আগের দু’দিনের পুরো ঘটনা বললাম। সব কথা শোনার পর উনি বললেন, ‘তুমি নিশ্চিত থাকো। যে মানুষ দায়িত্ব নিয়েছেন, তাতে তুমি ধরে নিতে পারো যে তোমার কাজ হয়েই গেছে।’ তারপর সুভাষদাও তাঁর সঙ্গে প্রণববাবুর ভালো সম্পর্কের কিছু ঘটনার কথা বলেন। এরপর সুভাষদা যে কথাটি বলেন, তা ছিল মারাত্মক। বলেন, ‘তুমি একটি বিদ্যালয়ের জন্য যা করছো তা সত্যিই দৃষ্টান্ত। কিন্তু যার সাহায্য, সহযোগিতা নিয়ে করছো, সে সব কথা জানলে আমাদের দলের সব নেতা সমানভাবে হজম করতে পারবে না। কর্মনিষ্ঠ হতে গেলে তার জন্য যে উদারতা থাকা দরকার তার অভাব আছে অনেকের মধ্যেই। তাই সকলকে সব কথা বলার প্রয়োজন নেই। যা বলবে সাবধানে বোলো।’ এও বললেন, এই মানুষটির থেকে রাজ্যের উন্নয়নের জন্য আমরা যে সাহায্য পেতে পারতাম, অনেকের দৃষ্টিভঙ্গিতে সংকীর্ণতা থাকায় তাও আমরা নিতে পারলাম না।

(চলবে)

You may also like