Corona: কেন পুরুষের মৃত্যুহার মহিলাদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ? হরমোন, লাইফস্টাইল, ইমিউনিটি? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

গোটা বিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১২ লক্ষ, মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের। এরই মধ্যে চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণের ভেদাভেদ না থাকলেও, করোনা আক্রান্ত এবং মৃতের ক্ষেত্রে কেন দেখা যাচ্ছে লিঙ্গ বৈষম্য?
কোভিড-১৯ এ মৃতদের ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদ প্রথম লক্ষ্য করা গিয়েছে চিনে, যেখান থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে গোটা দুনিয়ায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও চিনের একটি যৌথ সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, ৫৫ হাজার ৯২৪ জন করোনা আক্রান্তের রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করে দেখা গিয়েছে, কোভিড-১৯ এ পুরুষের মৃত্যুর হার ৪.২ শতাংশ আর মহিলাদের ২.৮ শতাংশ। সাম্প্রতিক এক তথ্যে উঠে এসেছে, চিনে করোনায় আক্রান্ত হয়ে পুরুষের মৃত্যুহার ২.৮ শতাংশ এবং মহিলাদের মৃত্যুর হার ১.৭ শতাংশ।

 

অন্যান্য দেশে করোনায় আক্রান্ত মহিলা ও পুরুষের মৃত্যুহার 

চিন ছাড়াও ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া বা আমেরিকা, সর্বত্রই একই ছবি। করোনায় মহিলাদের চেয়ে পুরুষের মৃত্যুহার বেশি। ইতালিতে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত পুরুষের মৃত্যুর হার ৭.২ শতাংশ, মহিলাদের ৪.২ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনায় মৃতদের মধ্যে প্রায় ৫৪ শতাংশ পুরুষর। ভাইরাস আক্রমণে মহিলার চেয়ে পুরুষের বেশি আক্রান্ত বা মৃত্যু হওয়ার ঘটনা এই প্রথম নয়। জন হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অফ পাবলিক হেলথের শিক্ষক ও গবেষক সাবরা ক্লেইন New York Times দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ভাইরাল ইনফেকশনের ক্ষেত্রে পুরুষরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেশি আক্রান্ত হন এবং তাঁদের উপর ভাইরাসের চরম প্রভাব বেশি হয়।

এখন প্রশ্ন হল, করোনা আক্রান্তের ক্ষেত্রে মহিলার চেয়ে পুরুষদের মৃত্যু হার বেশি কেন? এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্টভাবে কোনও উপসংহারে না আসতে পারলেও, কয়েকটি কারণকে প্রায় সবাই নিশানা করেছেন।

 

অস্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিমারীতে পুরুষের মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে প্রধান যে থিয়োরি উঠে আসছে তা হল, অস্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল। দুনিয়াজুড়ে করোনা আক্রান্তদের তথ্য বলছে, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফুসফুসের অসুখ থাকা কোভিড-১৯ আক্রান্তদের প্রাণসংশয় বেশি। আর এই অসুখ বা সমস্যাগুলি পুরুষদেরর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি।
তার অন্যতম প্রধান কারণ, মদ্যপান ও ধূমপানের অভ্যেস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০১৫ সালের একটি রিপোর্ট বলছে, সারা বিশ্বে মহিলাদের থেকে পাঁচগুণ বেশি মদ্যপান ও ধূমপান করেন পুরুষরা।
আর কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের মধ্যে ধূমপায়ীদের উপর এই ভাইরাসের প্রভাব যে তীব্র তা প্রমাণিত। করোনায় আক্রান্ত ধূমপায়ীদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা থেকে নিউমোনিয়া হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এও মনে করা হচ্ছে, হাতের আঙুলে ধরে সিগারেট মুখে নেওয়ার কারণেও করোনা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চিনে ৫০ শতাংশ পুরুষ ও মাত্র ৩ শতাংশ মহিলার ধূমপানের অভ্যেস। শুধু চিন নয়, ইতালি থেকে আমেরিকা সব দেশেই ধূমপায়ীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশি।

 

হাত ধোয়ার অভ্যেস 

করোনা সংক্রমণ আটকাতে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে বারবার হাত ধোওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন অতীত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মহিলাদের তুলনায় পুরুষরা হাত ধোয়ার অভ্যেসের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। ২০০৯ সালে আমেরিকার এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের পর মাত্র ৩১ শতাংশ পুরুষ হাত পরিষ্কার করেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৬৫ শতাংশ। শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের সর্বত্রই এই পরিসংখ্যান প্রায় একই।

 

পুরুষরা সহজে চিকিৎসা করান না 

এটাও প্রমাণিত সত্য যে, পুরুষদের স্বাস্থ্য সচেতনতা মহিলাদের চেয়ে কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শারীরিক অসুবিধা বড় না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে পুরুষদের একরকম অনীহা কাজ করে। এদিকে মহিলারা যে কোনও সমস্যায় আগেভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। করোনার ক্ষেত্রেও সেই একই ধারা লক্ষ্য করা গিয়েছে। চিন এবং ইতালির সমীক্ষা বলছে, বহু ক্ষেত্রেই উপসর্গ স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত নিজে থেকে ডাক্তারের কাছে যাননি পুরুষরা।

 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা 

করোনা বা যে কোনও ভাইরাস আক্রমণের ক্ষেত্রে মহিলাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরুষদের চেয়ে বেশি। যা করোনার মতো মারণ ভাইরাসের ক্ষেত্রেও প্রমাণিত হয়েছে বলে জানাচ্ছেন একদল বিশেষজ্ঞ। কিন্তু কেন?

 

হরমোন 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার এই পার্থক্যের জন্য অনেকাংশে দায়ী মহিলা ও পুরুষের হরমোনের পার্থক্য। ২০০২-০৩ সালে সার্স প্রাদুর্ভাবের সময় গবেষণায় ইঁদুরের ওভারি বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা, যা থেকে ইস্ট্রোজেনের মতো স্ত্রী হরমোন ক্ষরণ হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ওভারি বাদ দেওয়ার পর সার্স সহজে আক্রমণ করছে এবং মৃত্যুহারও বেড়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, সার্স ভাইরাস ও কোভিড-১৯ এর ৭৯ শতাংশ ‘জেনেটিক সিকোয়েন্সিং’ এক। স্ত্রী হরমোনের জন্য মহিলাদের কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষমতা বেশি বলে মনে করছেন তাঁরা।

 

এক্স ক্রোমোজোম 

মহিলাদের ইমিউনিটি বেশি হওয়ার আর একটি বড় কারণ তাদের অতিরিক্ত X ক্রোমোজোম।
মহিলাদের শরীরে দুটি X ক্রোমোজোম আর পুরুষদের ক্ষেত্রে একটি X এবং একটি Y ক্রোমোজোম থাকে। মহিলাদের শরীরে দ্বিতীয় X ক্রোমোজোমের উপস্থিতির জন্য ভাইরাস প্রতিহত ক্ষমতা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

করোনা নিয়ে এখনও পর্যন্ত যা গবেষণা হয়েছে, তাতে অভ্যেস, ইমিউনোলজিক্যাল হরমোন ও জেনেটিক ফ্যাক্টরের কারণে এই ভাইরাসে আক্রান্ত মহিলাদের চেয়ে পুরুষদের মৃত্যুহার অনেক বেশি বলে মনে করছেন বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা।

Comments are closed.