২০২৪ সালে মোদীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে তৃতীয় বা চতুর্থ ফ্রন্ট নিয়ে সলতে পাকানোর কাজ যে তিনি করছেন না, সোমবার স্পষ্ট করেছেন প্রশান্ত কিশোর। এদিকে মঙ্গলবার অবিজেপি-অকংগ্রেস ১৫ দলকে নিয়ে যশবন্তের রাষ্ট্র মঞ্চের ব্যানারে বৈঠক ডেকেছেন শরদ পাওয়ার। পাওয়ারের বৈঠকে ডাক পেয়েছেন সাংবাদিক থেকে শুরু করে প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, আইনজীবী, পরিচালকও।
অর্থাৎ একটা জিনিস পরিষ্কার, ফ্রন্ট গড়ার লক্ষ্যে ওই বৈঠক ডাকেননি শরদ পাওয়ার। তাহলে কি পরিকল্পনা বহু যুদ্ধের পোড় খাওয়া সৈনিক পাওয়ারের?
শরদ পাওয়ারের পরিকল্পনার হদিশ না মিললেও পিকের কথা থেকে একটি নির্দিষ্ট ইঙ্গিত পাচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সোমবার শরদ পাওয়ারের সঙ্গে বৈঠক সেরে বেরিয়ে পিকে বলেছিলেন, আমি বিশ্বাস করি না যে তৃতীয় বা চতুর্থ ফ্রন্টের মতো কিছু একটা গড়ে মোদীর বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য লড়াইয়ে যাওয়া যায়। একে সেকেলে ধারণা বলে নাকচ করেছেন পিকে। এখন প্রশ্ন হল তাহলে কোন ফর্মুলা প্রয়োগ করার কথা ভাবছেন প্রশান্ত কিশোর?
আরও পড়ুন: তৃণমূলে যোগ দিলেন আসানসোলের সমাজকর্মী চন্দ্রশেখর কুণ্ডু ও বাঁকুড়ার কয়েকশো কংগ্রেস নেতা-কর্মী
আর এখানেই লুকিয়ে রহস্য! যে রহস্যের তল পেতে ভরসা রাখতে হবে পাটিগণিতে। কী সেই ফর্মুলা, যার জোরে মোদীকে হারানোর পরিকল্পনা করছেন প্রশান্ত কিশোর?
লোকসভায় লড়াই হবে সরাসরি বিজেপির সঙ্গে। ফ্রন্ট জাতীয় কিছুর ব্যাপার না থাকলে দেশের সব রাজ্যেই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করবে বিভিন্ন দল। এখানেই লুকিয়ে পিকের হিসেব।
অঙ্ক বলছে, দেশে ১৯ টি রাজ্য এবং ৫ টি কেন্দ্রশাসিত এলাকা মিলিয়ে মোট ২০৪ টি লোকসভা আসনে কংগ্রেস হয় শাসক বা প্রধান বিরোধী। এই আসনগুলোতে কারও সঙ্গেই জোটেও যাবে না কংগ্রেস। এতে যুক্ত আছে উত্তর-পুর্বের ২৫ টি আসন। বাকি ১৭৯ টি আসনের বিন্যাস এরকম।
আরও পড়ুন: ১ ফেব্রুয়ারি ফের উত্তরবঙ্গে মমতা, যাবেন আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটা, জলপাইগুড়ি
মধ্যপ্রদেশ ২৯ আসন, কর্নাটক ২৮ আসন, গুজরাত ২৬ আসন, রাজস্থান ২৫ আসন, কেরল ২০ আসন, পাঞ্জাব ১৩ আসন, ছত্তিসগড় ১১ আসন, হরিয়ানা ১০ আসন, উত্তরাখণ্ড ৫ আসন, হিমাচল প্রদেশ ৪ আসন, গোয়া ২ আসন, দাদরা নগর হাভেলি ও দমন দিউ ২ আসন, আন্দামান-নিকোবর, চণ্ডীগড়, লাদাখ, পুদুচেরিতে ১ টি করে আসন।
এই ২০৪ আসনের সঙ্গে যোগ করুন জম্মু-কাশ্মীরের ৫ টি লোকসভা আসন। ওড়িশার ২১ টি আসনের ক্ষেত্রেও নবীন পট্টনায়ক কোন দিকে যাবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থাৎ মোট ২৩০ আসন। এখনও বাকি ৩০০ র বেশি লোকসভা আসন। যেখানে বিজেপির লড়াই হবে আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার স্ট্রাইক রেট। দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেস যেখানে বিজেপির সঙ্গে সোজাসুজি লড়াইয়ে নামছে, সেখানে বিজেপির স্ট্রাইক রেট ৯০ শতাংশের বেশি। কিন্তু বিজেপি যখন অন্য কোনও আঞ্চলিক দলের বিরুদ্ধে নামছে তখন স্ট্রাইক রেট অর্ধেকের কাছাকাছি। অর্থাৎ, কংগ্রেসের প্রভাব মুক্ত ৩০০+ আসনে আঞ্চলিক দল বনাম বিজেপি লড়াই হলে, জয় পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাংলার সাম্প্রতিক ভোট তারই সাক্ষী।
এই প্রসঙ্গে পিকের হাতে গরম উদাহরণ বাংলা। সেখানে বাম-কংগ্রেসও লড়াইয়ে ছিল। কিন্তু দেখা গেল তাদের সম্মিলিত ভোট গিয়ে ঢুকল তৃণমূলের খাতায়। অর্থাৎ দেশের ৩০০ এর বেশি লোকসভা আসনে বিজেপিকে কড়া মোকাবিলায় ফেলার জন্য কার্যত কংগ্রেসকে দরকার হচ্ছে না।
এবার দেখুন এই ৩০০ এর বেশি লোকসভা আসনে বিজেপির প্রধান চ্যালেঞ্জার কারা। ৩০০ আসনের হিসেবে ঢুকছে ৮০ আসনের উত্তরপ্রদেশ, ৪৮ আসনের মহারাষ্ট্র, ৪২ আসন বিশিষ্ট বাংলা, ৩৯ আসনের তামিলনাড়ু। এছাড়াও আছে বিহারের মতো বড় রাজ্য যেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে মূল লড়াই লড়বেন তেজস্বী যাদব। ভোটের পাটিগণিত বলছে যে ৩০০+ আসনে বিজেপিকে হারানোর সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি। কারণ সেখানে মোদীকে লড়তে হবে মমতা, স্ট্যালিন, কেজরিওয়াল, শরদ পাওয়ারের বিরুদ্ধে, তাঁদের নিজের রাজ্যে।
প্রশান্ত কিশোর নিজে এখনও তাঁর পরিকল্পনার কথা খুলে জানাননি। কিন্তু ফ্রন্টে যে তাঁর আগ্রহ নেই তা জানিয়েছেন। তাহলে পড়ে থাকে একের বিরুদ্ধে একের লড়াইয়ের রাজ্যওয়ারি ফর্মুলা। যে ফর্মুলায় কংগ্রেসকে বাইরে রেখেও, বেশিরভাগ আসনে বিজেপিকে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা যায়। ২০২৪ লোকসভার দিকে তাকিয়ে প্রশান্ত কিশোর কোন পরিকল্পনায় শান দেন, সেটাই এখন দেখার।



